সর্বশেষ

জামালগঞ্জে বন্যা পরিস্তিতির অবনতি

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে বন্যা পরিস্তিতির অবনতি হয়েছে। বন্যার পানিতে থৈ থৈ করছে উপজেলার চারপাশ। ইতোমধ্যে ভেসে গেছে উপজেলার রাস্তাঘাট ও হাট-বাজার। এছাড়াও পানিতে তলিয়ে গেছে জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ ও জামালগঞ্জ-সাচনা বাজারের সংযোগ সড়ক।ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

শুধু তাই নয়, বাড়িঘরে পানি ঢুকে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে মানুষের জীবনে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারও মানুষ। এ অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বন্যাকবলিতরা। এদিকে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এছাড়া গৃহপালিত পশু নিয়ে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বন্যার্তরা। বানে ভাসা নিরুপায় মানুষ সাহায্যের আকুতি জানিয়েছেন। আজ রবিবার (২৮ জুন) বন্যাকবলিত এমন জলমগ্ন অসহনীয় পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, আজ রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানির প্রবাহ ৭.৮ মিটার হলে তাকে বিপদসীমা হিসেবে গণ্য করা হয়। রবিবার সকালে সুরমায় পানি প্রবাহের গতি বাড়ে ৮.৫ মিটার পর্যন্ত। গতকাল এই প্রবাহ ছিল ৮.১৫ মিটার। রবিবার সকালে সুরমার পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত গড়ালেও দুপুরে এর গতি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ পাউবো অফিস। দিনে বৃষ্টি না থাকায় পানি কিছুটা কমেছে। তবে বন্যা প্রলম্বিত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এতে করে মানুষের দুর্ভোগ যে আরও বাড়বে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের আরশিনগর গ্রামের মো. দিলোয়ার হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ৪ শিশু সন্তানকে নিয়ে পানিবন্দি হয়ে ঘরে বসে আছেন তিনি। এ বন্যায় মা হারা সন্তানদের নিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান মো. দিলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘বউ মারা গেছে প্রায় ২ বছর হইয়া গেছে। এই ৪ বাচ্চারে লইয়া পানিতে ভাইসা যাইতাছি। উঠানে পানি, ঘরেও পানি। বের হওয়ার কোনো জায়গা নাই। এমনিতেই অনেকদিন কাজ-কাম নাই। এখন কিতা খাইমু, কেমনে চলমু?’

সাচনা বাজার ইউনিয়নের হরিহরপুর (বাগহাঁটি) গ্রামের শামসুল হক বলেন, ‘পানিতে আটকা পইড়া ঘরে বইসা আছি। চতুর্দিকে পানি। কই যামু, কী করমু কিছু বুঝতাছি না। করোনার লাইগ্যা এমনেই বিপদ। এর মাঝে আইছে বন্যা। মড়ারে আরও মাইরা ফেলার উপক্রম হইছে। কোনো সাহায্য-সহযোগিতা না পাইলে আর বাঁচতাম না।’

বেহেলী ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের প্রজেশ দে বলেন, ‘হাত-পাও ঠান্ডা অইয়া আইতাছে। নিজেও মরমু, পোলাপানও মরব। এই বন্যায় গরু আর মানুষ এক ঘরে বসবাস করতাছি। বিপদের উপর আরও বিপদ আইসা পড়ছে। কিভাবে বাঁচমু এই চিন্তায় জান বাঁচে না। আমরারে বাঁচাইতে সরকারি সাহায্য খুব দরকার।’

কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সহ-সভাপতি মো. আলী আমজাদ বলেন, ‘বন্যার পানি আমার ঘরেও প্রবেশ করেছে। এর যন্ত্রণা কতটা কঠিন সেটা আমার চেয়েও বেশি অনুধাবন করছে সাধারণ মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে অনেকের বাড়িঘর। যাদের ঘরে আগুন জ্বালানোর মতো একটা দিয়াশলাই নেই, তাদের অবস্থা কী হবে? অনেকে করোনার জন্য ধান বিক্রি করতে পারেননি। বন্যার পানিতে তাদের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় বন্যার্তদের ঢালাওভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা খুব প্রয়োজন।’

জামালগঞ্জে বন্যায় ভাসছে মানুষের ভাগ্য। এ পরিস্থিতিতে বেশি বিপদে পড়েছেন নিম্নাঞ্চলে থাকা খেটে খাওয়া মানুষ। উপজেলা সদর থেকে একটু দূরে বাস করা বন্যাকবলিত মানুষ চরম দুর্যোগকাল অতিক্রম করছেন। তারা ঘর থেকে বের হতে পারছে না। নানা সঙ্কটের মুখোমুখি এসব মানুষের মাঝে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ সরবরাহ প্রয়োজন বলে মনে করছে সচেতন মহল।

এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, ‘বন্যার্তদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে ২৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা ছাড়াও পানিবন্দি অন্যদের জন্যও খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো হবে।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ