সর্বশেষ

অস্ট্রেলিয়ায় উট হত্যা ও কোরআনিক ইতিহাস

অস্ট্রেলিয়ায় অত্যধিক পানি পানের আশঙ্কায় ১০ হাজার উট হত্যার একটি খবর মিডিয়ায় আসে। এই খবরে কোরআনি ইতিহাস মনে পড়ল। ইতিহাসে অত্যধিক পানি পানের অভিযোগ তুলে উট হত্যার ঘটনা সম্ভবত ছামুদ জাতির পর এটাই প্রথম!
হযরত সালেহ (আ.)-এর সম্প্রদায় সামুদ জাতি শিল্প ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আদ জাতির পর আল্লাহ তাআলা তাদের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধি দান করেছেন। কিন্তু তাদের জীবনযাপনের মান যতটা উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল, মানবতা ও নৈতিকতার মান ততই নিম্নগামী ছিল। একদিকে উন্মুক্ত প্রান্তরে পাথর খোদাই করে করে প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে সমাজে কুফর, শিরক ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটছিল। ন্যায়-ইনসাফ বলে সে সমাজে কিছুই ছিল না। অন্যায় ও অবিচারে সমাজ জর্জরিত হতে থাকে। সমাজে চরিত্রহীন লোকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হজরত সালেহ (আ.) যে সত্যের দাওয়াত দিয়েছেন, তাতে নিম্ন শ্রেণির কিছু লোক সাড়া দেয়।
সালেহ (আ.) সারা জীবন তাদের হেদায়েতের পথে আনার চেষ্টা করেছেন। এতে অল্প কিছু সঙ্গী ছাড়া গোটা জাতি তাঁর অবাধ্যই থেকে যায়। একপর্যায়ে তারা দাবি করে, আপনি যদি সত্যি নবী হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের ‘কাতেবা’ নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবতী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে দেখান। এটি দেখাতে পারলে আমরা আপনার ওপর ঈমান আনব।

সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহর কুদরতে পাহাড় থেকে একটি সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের হয়। তা দেখে কিছু লোক ঈমান আনে।

উষ্ট্রীটি ছিল অনেক বড়। তাই অনেক বেশী বেশী খেত। মাঠের সমস্ত ঘাস ও কূপের সমস্ত পানি সে একাই খেয়ে ফেলতো। দেশের পশুপাল এই উটটিকে দেখলেই ভয়ে ছুটে পালাতো। তাই দেশবাসী উটটিকে নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত ও অস্থির হয়ে পড়লো। হযরত সালেহ (আঃ) তাদেরকে সতর্ক করে দিলেন যে, এই উটটি তোমাদের জীবন-মৃত্যুর পরীক্ষার বস্তু। কাজেই এর কোন অনিষ্ট করবে না। তাহলে আল্লাহর গযব নেমে আসবে। এবং তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।

সালেহ (আঃ) তাদেরকে একটি সুপরামর্শ দিলেন যে, আল্লাহর উট একদিন মাঠে চড়ে বেড়াবে, ঘাস খাবে ও কূপের পানি পান করবে। সেদিন তোমাদের পশুপাল গৃহে
আটক থাকবে। আর একদিন তোমাদের পশুপাল মাঠে চড়ে বেড়াবে ও পানি পান করবে। এভাবে আল্লাহর উট ও তোমাদের পশু-পাখি পালাক্রমে একদিন মুক্ত থাকবে ও একদিন আটক থাকবে।

কিন্তু তাদের সর্দাররা সালেহ (আ.) কথা শুনেনি ও ঈমান আনেনি। তারা সালেহ (আঃ) কে বললো, তুমিতো আমাদের মতই সাধারন মানুষ, তোমার উপর কোন ওহী নাযিল হয়নি। নিজেকে বড় প্রমান করার জন্যই এসব করছো। তারা অসৎ পথ অবলম্বন করলো। আল্লাহর রাসুল সালেহ (আঃ) এর কোন কথাই তারা শুনলো না, মানলোও না। একদিন বাচ্চাসহ উটটি জবেহ করে খেয়ে ফেললো। তারপর সালেহ (আঃ) কে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করতে লাগলো।

এতে সালেহ (আ.) তাঁর জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসার ঘোষণা দেন। তিনি তাদের সতর্ক করে দেন যে তিন দিন পরই আল্লাহর আজাব তোমাদের ধ্বংস করে দেবে।

নির্ধারিত সময়ে আসমানি আজাব এসে অবিশ্বাসীদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারপর সীমা লঙ্ঘন কারীদের মহানাদ আঘাত করে। ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে (ধ্বংস হয়ে যায়)। যেন তারা কখনোই সেখানে বসবাস করেনি। জেনে রেখো, ছামুদ জাতি তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। আরো জেনে রেখো, ধ্বংসই হলো ছামুদ জাতির পরিণাম।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬৭-৬৮)

গগনবিদারী আওয়াজ সামুদ জাতির কর্ণকুহরে আঘাত হানে। সেই আওয়াজে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। একসময় যে জাতি পাহাড়ে ঘর নির্মাণ করত, পৃথিবীতে যাদের চেয়ে শক্তিশালী কোনো জাতি ছিল না, আসমানি আজাবে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। উদ্ধত ছামুদ জাতির প্রতি হজরত সালেহ (আ.)-এর হুঁশিয়ারি সত্যি বাস্তবায়িত হয়েছে। হঠাৎ একদিন প্রচণ্ড শব্দে ভূমিকম্প তাদের নাস্তানাবুদ করে ফেলে। বজ্রপাতের ভয়ংকর শব্দে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত হয়ে যায়। অবশেষে তাদের অপমৃত্যু ঘটে।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ‘তবুক অভিযানে যখন সামুদ জাতির হেজর অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন রসুল (সাঃ) নিজ সঙ্গীদের বিশেষ ভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ঐ এলাকার নিদিষ্ট একটি কূপ ছাড়া অন্য কূপের পানি যেন কেউ ব্যবহার না করে। ভুলে এক সাহাবী ওখানকার একটি কূপের পানি দিয়ে রুটি বানাবার আটা তৈরী করলে তা সব ফেলে দেয়া হয়েছিল। নবী করীম (সাঃ) বলেছিলেন, সে এলাকার মধ্য দিয়ে যাবার সময় সবাই যেন ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় কেঁদে কেঁদে দ্রুত বেগে এলাকাটি ত্যাগ করে।
এই অঞ্চলটি মদীনা হতে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। বর্তমানে আরবী মানচিত্রে এটি ‘মাদায়েনে সালেহ’ অর্থাৎ সালেহ (আঃ) এর বস্তি সমূহ নামে পরিচিত।

আদতে অস্ট্রেলিয়ার উট স্থানীয় কোন প্রাণী না। ইংরেজদের দ্বারা ভারত, আফগানিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো থেকেই উট সেখানে নেওয়া হয় এবং পরে এর বিস্তার ঘটে। ইউরোপেও মুসলিম দেশগুলো থেকেই উট প্রথম ঢোকে। উটের এ ন্যাশনালিটি ক্রাইসিস না থাকলে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে এভাবে বনের উট হত্যা সম্ভব ছিল না! নানা জায়গা থেকেই এ নিয়ে বাধা আসত এবং প্রশ্ন উঠত।

সে যাই হোক, ইতিহাস নানাভাবেই বারবার ফিরে আসে। আদ জাতিকে ধ্বংসের আগে আল্লাহ নূহ (আ.) এর জাতির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলেছিলেন। ছামুদ জাতির জন্য ছিল নূহ ও আদ জাতির ইতিহাস। আর আমাদের জন্য আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে নূহ, আদ, ছামুদ জাতির ইতিহাস তুলে ধরে  সাবধান করেছেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য এটাই যে, অন্যসব গজবে নিপতিত জাতির মতো আমরাও আল্লাহর সেই সাবধান বাণীকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞার দুঃসাহস দেখিয়ে চলেছি! আল্লাহ আমাদের পূর্ববর্তীদের থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ