সর্বশেষ

কুদরতউল্লাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা জমির উদ্দিনের জানাযা ও দাফন সম্পন্ন

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কুদরতউল্লাহ জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব, প্রখ্যাত আলেম ক্বারী মাওলানা জমির উদ্দিনের জানাযা সম্পন্ন হয়েছে। রোববার বেলা দুই টায় তার ৪২ বছরের প্রিয় কর্মস্থল কুদরত উল্লাহ মসজিদে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় বিভিন্ন শ্রেনীপেশার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। মসজিদের তিন তলা ও মাঠ ছাপিয়ে সিটি কপোরেশন মাঠ পযন্ত বিস্তৃত হয় জানাযার সারি। সরকারের কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মসজিদ কর্তৃপক্ষ সবজন শ্রদ্ধেয় এ আলেমের জানাযার আয়োজন করে। জানাযায় ইমামতি করেন তার ছেলে তালহা মোস্তফা। জানাযা শেষে তাকে নগরীর মানিকপীর রহ. এর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জানাযার আগে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন কমিটির সেক্রেটারী ও দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস-উন নুর। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সাবেক এমপি অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, নেজামে ইসলাম পাটির সভাপতি এডভোকেট মাওলানা আব্দুুর রকিব চৌধুরী, জালালাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা সুলাইমান হোসেন, কুদরত উল্লাহ মার্কেটের সেক্রেটারী মাওলানা খলিলুর রহমান এবং কুদরত উল্লাহ মসজিদের বতমান ইমাম ও খতিব শায়খ সাঈদ আল মাদানী। আরো উপস্থিত ছিলেন মসজিদের মোতাওয়াল্লি বদরুল ইসলাম, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হাফিজ আব্দুল হাই হারুনসহ সিলেটের বিভিন্ন স্তরের গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ।
এদিকে, জানাযায় আসা শত শত মুসল্লির মাঝে অনেককে তাদের প্রিয় আলেমকে হারিয়ে আবেগে আপ্লুত হতে দেখা যায়। কান্নাজড়িত কন্ঠে তারা বলেন, মাওলানা জমির উদ্দিন ছিলেন একজন বিদগ্ধ আলেম ও ইসলামী সমাজ বিনিমিাণের এক সিপাহাসালার। তার হৃদয়গ্রাহী তেলাওয়াত ও তাফসির যে কাউকেই মুগ্ধ করতো। এই কঠিন সময়ে তার চলে যাওয়া নিশ্চয়ই অপূরণীয় ক্ষতি।
সিলেটের এই প্রথিতযশা আলেম শনিবার রাত ১১টায় তিনি নিজ বাসায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি কয়েকদিন থেকে রোগাক্রান্ত ছিলেন, তবে পরশুও তিনি কুদরত উল্লাহ মসজিদে জুম’আর নামাজ আদায় করেন।
সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত : হৃদয়গ্রাহী তেলাওয়াত ও কোরআন হাদীসের অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী বিচক্ষণ এ আলেমের জন্ম ১৯৪২ সালে দক্ষিণ সুরমার করিমপুরে। তার পিতা মরহুম মুহাম্মদ আব্দুল গণি ছিলেন একজন সমাজসচেতন ব্যাক্তি ও মাতা ময়মুননেছা ছিলেন একজন দ্বীনদার নারী। শিক্ষাজীবনের শুরুতে তিনি বালাগঞ্জের কুবেরালী বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের পাঠ নেন। এরপর ১৯৫৪ সালে রাখালগঞ্জ দারুল কোরআন আলীয়া মাদ্রাসায় ইবতেদায়ী ৩য় শ্রেনী থেকে ছরফ জামাত পযন্ত অধ্যয়ন করেন। এরপর ১৯৬১ সালে ইলমে ক্বিরআত হাসিলের লক্ষ্যে শায়খুল কোররা মৌলভী বশির উদ্দিনের খেদমতে চলে যান। তার কাছ থেকে ১৯৬২ সালে ক্বিরঅত ও তাজবিদের সনদ লাভ করেন। এরপর আবার রাখালগঞ্জ সিনিয়র মাদ্রাসায় ভতি হয়ে ১৬৫ সালে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীণ হন। ১৯৬৭ সালে সতপুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম, ১৯৬৯ সালে ফাজিল ও ১৯৭১ সালে কামিল পরীক্ষায় উত্তীণ হন। এরপর ইলমে হাদিসের সনদ লাভ করেন গাছবাড়ী আলীয়া মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ শায়খুল হাদীস মাওলানা শফিকুল হক বুলবুল রহ. এর কাছ থেকে। তাফসিরের সনদ হাসিল করেন সতপুর মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা গোলাম হোসাইন রহ. এর কাছ থেকে।
কমজীবনের শুরুতে ১৯৭১ সালে কিছুদিন সতপুর দারুল হাদীস আলীয়া মাদ্রাসায় জুনিয়র শিক্ষক ছিলেন। এরপর কমলগঞ্জ সফাত আলী আলিয়া মাদ্রাসায় ৯ মাস শিক্ষকতা করেন। একইসাথে কেরামতনগর জামে মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।এরপর তার উস্তাদ আখলাক হোসে চৌধুরীর আগ্রহে বিলুপ্ত প্রায় হাটুভাঙ্গা দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসায় যোগদান কওে মাদ্রাসাটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি ১১ মাস সেখানে অবস্থান করে মাদ্রাসার জন্য ১ একর জায়গা সংগ্রহ করেন। ১৯৭৮ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কুদরত জামে মসজিদের প্রধান ইমাম হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। পাশাপাশি ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সাল পযন্ত কুদরত উল্লাহ ফুরক্বানিয়া মাদ্রাসায় মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার একান্ত উদ্যোগে নিজগ্রামে আল জামিয়াতুল ইসলামীয়া নামে ইসলামী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯৪ সালে আন্তজাতিক ইসলামী ত্রাণ সংস্থা আয়োজিত ইলমে আকায়িদ, ইলমে হাদীস ও আছমাউররিজাল শাস্ত্রের উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন। তিনি জালালাবাদ ইমাম সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য, ইত্তেহাদুল উম্মা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় মজলিসের প্রাক্তন সদস্য ও সিলেট বিভাগীয় পরিচালক, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল ক্বোররা সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা, আন্তজাতিক ইসলামী ত্রাণ সংস্থা সৌদী আরবের সাবেক মুবাল্লিগ, বৃহত্তর ঘাসিটুল মাদ্রসার প্রতিষ্ঠাতা ও সুপার, সিলেট যাকাত বোডের সদস্য, আঞ্জুমানে খেদমতে কোরআন সিলেটের সাবেক সহ সভাপতি, জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেটের সহ সভাপতিসহ অসংখ্য ইসলামী প্রতিষ্ঠানে অনবদ্য ভুমিকা পালন করেন। যা ইতিহাসের সোনালী পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে।
তিনি একজন মৌলিক লেখক হিসেবেও ছিলেন সমাদৃত। তার লিখিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে- আমি ইত্তেহাদুল উম্মায় যোগ দিলাম কেন? আপনি যোগ দেবেন কেন? আধ্যাত্বিক পরিবেশ, কিতাবুল হজ্ব, হুসনুল কোরআন, দ্বীনদারী জীবন। তিনি সিলেটের বিভিন্ন মসজিদে নিয়মিত আল কোরআনের তাফসির পেশ করতেন। তিনি বেশ কয়েকবার হারমাইন শরিফাইন জিয়ারত করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিজচালিত নাস্তিক মুরতাদ প্রতিরোধ আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখেন। পারিবারিক জীবনে তিনি ২ কন্যা ও ৭ পুত্র সন্তানের জনক।

সূত্র : দৈনিক জালালাবাদ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ