সর্বশেষ

পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হোক ‘সন্তানের প্রতি বাবা-মার দায়িত্ব’

আমরা ছোটবেলা থেকে দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে অনেক প্রবন্ধ বা রচনা পড়েছি বা লিখেছি। যেমন ধরুন প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য, পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য, স্বদেশ প্রেমসহ (দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য) বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়ার পাশাপাশি আরোহণ করেছি জ্ঞান, যা দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো পালন করে যাচ্ছি। বই হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার বা বই মানুষকে জ্ঞান দেয়, এটি চিরন্তন সত্য। কিন্তু সেই চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা হোক বা ইংরেজি হোক কোথাও ‘সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য’ নিয়ে প্রবন্ধ পড়িনি, এমনকি চোখেও পড়েনি।

ভাবসম্প্রসারণে পড়েছি ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা, সব শিশুরই অন্তরে’। অর্থাৎ আজকে যে শিশু আগামীকাল সে হবে বাবা, হবে মা। সুশিক্ষিত হয়ে তারা গড়বে সুন্দর পরিবার, সমাজ, দেশ তথা পৃথিবী। সুতরাং সন্তানকে নিয়ে শুধু সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখলেই তো হবে না! এ স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়ন করতে গেলে চাই সন্তানদের প্রতি সঠিকভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন। তাই পাঠ্যসূচিতে প্রবন্ধ হিসেবে ‘সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য’ অন্তর্ভুক্ত করাটা সময়োপযোগী।

পরিবারের শ্রেণি বিভাগ অনুযায়ী পরিবারের প্রধান বাবা বা মা যিনিই হন না কেন, তাকেই পরিবারে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। সুখ ও শান্তিময় জীবনযাপনের জন্য সুসন্তান তৈরি করাও একটি অপরিহার্য বিষয়। সন্তানের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য বাবা-মার মধ্যে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ দাম্পত্যজীবন অত্যাবশ্যক। দাম্পত্যজীবনে ঝগড়াবিবাদ, মনোমালিন্য থাকলে সন্তানের ওপর এর প্রভাব যে পড়বে, এটি হলফ করে বলা যায়।

সন্তান গর্ভে আসার পর অনাগত সন্তানের জন্য মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, হালাল খাদ্যের ব্যবস্থা করা, সন্তান ভূমিষ্ঠের পর পরম স্নেহ, মমতার পরশ বুলিয়ে তাদের লালন করা। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, সন্তান আল্লাহর দেয়া নেয়ামত এবং তার (আল্লাহর) পক্ষ থেকে বাবা-মার কাছে রক্ষিত আমানত। সন্তানের নিরাপত্তা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করাও বাবার দায়িত্ব। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা ফুলের কলি, আর সুশিক্ষা দানের মাধ্যমেই কেবল সেই কলিকে প্রস্ফুটিত করা সম্ভব। ব্যত্যয় হলে ঐশী, দিহানের মতো বয়ে আনবে কু-নাম। আর নেশার জন্য টাকা না পেয়ে বাবা-মাকে করবে অপমান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘সন্তানকে সুশিক্ষা বা আদব-আখলাক শিক্ষা দান করাই সন্তানের জন্য পিতার শ্রেষ্ঠ উপহার।’

সন্তান ছেলে মেয়ে যাই হোক না কেন, সন্তান সন্তানই। তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। বরং মেয়ে সন্তান যেহেতু বিয়ে হলে অন্যত্র চলে যাবে, তাই মেয়েকে একটু আদর বেশি করলে দোষ হবে না। আর এটি মহানবীর সুন্নতও বটে।

উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পড়াশোনার বিষয়টি সন্তানদের ওপর ছেড়ে দেয়াই ভালো। আমরা বাবা-মারা চাই সন্তান ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক, বড় বড় কর্মকর্তা হোক। কিন্তু আমরা চাইলেই তো আর হবে না! সন্তানের সেই মেধা ও যোগ্যতা থাকতে হবে। তারা নিজে থেকেই পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বেছে নেবে। চাপিয়ে দেয়ার ফলাফলটা ভালো নাও হতে পারে।

ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে সকল প্রকার অসৎ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে। সেটা যে ধর্মই হোক না কেন। জন্মের পর শিশু গৃহেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। আর মা-ই শিশুর জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারপরেও আচার-ব্যবহার, নিয়মানুবর্তিতা, নৈতিকতা, ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কিত বিষয়গুলো শিশু বাবা-মার থেকেই গ্রহণ করে। তাই বাবা-মাকেই ধর্মীয় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সন্তানের ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে ধারণা থাকলে সে কখনো অন্যায়, অসৎ কর্মকাণ্ডে যে জড়িত হবে না, তা বলা যায়।

সন্তানকে ধৈর্যশীল ও কষ্ট সহিষ্ণু করে গড়ে তুলতে হবে। বিলাসবাসনে গা ভাসিয়ে বড় হলে হতে পারে অলস, যা তাদের জীবনে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একজন আদর্শ মায়ের দায়িত্ব হলো, সন্তান কোথায় যায়, কি করে, কাদের সাথে মিশে বা চলাফেরা করে, বন্ধু-বান্ধবরা কেমন প্রকৃতির, সন্ধ্যার পর বাইরে অকারণে আড্ডা দেয় কিনা, পড়াশোনা ঠিকভাবে করে কিনা, বাড়িতে ফেরে কখন—এগুলোর খোঁজখবর রাখা। তাহলে সন্তান হবে না বিপথগামী, ইভটিজার, ধর্ষণকারী, ছিনতাকারী, সুদখোর, ঘুষখোর, চাঁদাবাজ। হবে না মাদকাসক্ত, হবে না কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। সন্তান হয়ে উঠবে সত্যিকার অর্থেই মানুষ, বাবা-মার পাশাপাশি দেশের জন্য বয়ে আনবে সুনাম ও সম্মান।

লেখক : সাংবাদিক
masud.org2018@gmail.com

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ