সর্বশেষ

বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি সুনামগঞ্জে

টানা বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলা দুর্গম হাওর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায় খরচার হাওর ও হালির হাওরে থৈ থৈ করছে বানের পানি। হাওরের ঘোলা জল ঢুকে পড়েছে মানুষের বসত বাড়ি ও আঙিনায়। বসতঘর থেকে খড়ের ঘর গোয়াল ঘর সর্বত্র বানের পানি ঢুকে পড়েছে। হাওর এলাকার বসতবাড়ির তিল পরিমাণ জায়গা নেই, যেখানে বানের পানি প্রবেশ করেনি। বাড়ির আঙিনাগুলো ৫ থেকে ৬ ফুট পানিতে তলিয়ে আছে। আবার কোনো কোনো বাড়ির উঁচু ভিটেমাটি ধুয়ে ফেলতেছে হাওরের উত্তাল ঢেউ।

বানভাসী লোকজন ঘরের ভেতরে চৌকিতে কোন রকমে দিনাতিপাত করছেন। কেউ কেউ আবার নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পরিবার পরিজন ও গবাদী পশুসহ আশ্রয় নিয়েছেন। গো খাদ্যের খড়ের গাদাগুলো বেশ কিছু দিন যাবত পানিতে নিমজ্জিত থাকায় ভিজে পচন ধরেছে। হাওরের উত্তাল ঢেউ থেকে বসত ভিটে রক্ষার জন্য বাঁশের খুঁটি পুঁতে দিচ্ছেন বাড়ির চারপাশে। বানভাসী লোকজন কোমর পানিতে হেঁটে দূরদূরান্তের টিউবওয়েল থেকে বিশুদ্ধ পানীয় জল সংগ্রহ করছেন। দুর্গম হাওর এলাকায় এখনো পৌঁছেনি পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার ও ত্রাণ সামগ্রী। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হাওর এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামগুলো দেখা দিয়েছে শুকনো খাবারের সংকট। আয় রোজগার বন্ধ থাকায় খেটে খাওয়া মানুষেরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা হাওরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না।

অন্যদিকে করোনার কারণে তারা স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে মাছের দাম পাচ্ছেন না। নৌকা বা ¯িপড বোট চড়ে গ্রামে গেলে নারী পুরুষ ও শিশুরা এগিয়ে আসেন শুকনো খাদ্য সামগ্রী পাওয়ার আশায়। ঘরে চাল থাকলেও রান্নাঘর বসতঘর পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় কেউ রান্না করে খাবার খেতে পারেন না। থেমে থেমে বর্ষণের কারণে গ্রামের লোকজন কর্মহীন অবস্থায় ঘরে বসে দিন কাটাচ্ছেন। জামালগঞ্জ উপজেলা বেহেলী ইউনিয়নের রাধানগর, হরিনাকন্দি, ইনাতনগর, হাওরিয়া আলীপুর, বদরপুর, বেহেলি, ইসলামপুর, রহমতপুর, নিতাইপুর, শিবপুর, রাধানগর নুতনহাটি, হরিনাকন্দি নুতনহাটি, গোপালপুর, চন্ডীপুরসহ অনেক গ্রাম ঘুরে দেখা যায় দুর্গত মানুষেরা ত্রাণ পাওয়ার প্রহর গুনছেন। বেহেলি ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল হাসিম অভিযোগ করে বলেন, দুর্গম হাওর এলাকা দুর্গত লোকজন ত্রাণ সামগ্রী এমনকি শুকনো খাবারও পাচ্ছেন না। কারণ দুর্গম এলাকায় কেউ ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যেতে চান না। ইমরুল হাসান বলেন, যারা যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তারাই কেবল ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছেন। পক্ষান্তরে দূর এলাকার লোকজন পাচ্ছেন না। দুর্গম হাওর এলাকায় একবারে বেশি পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী দেয়ার দাবি করেন তিনি।

হাওরিয়া আলীপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, গ্রামের একপাশে নদী অন্যপাশে সুবিশাল হালির হাওর। হাওরে বাতাস হলে উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে তাদের বসত বাড়ির মাটি ধুয়ে মুছে নিয়ে যায়। চারদিক থেকে ঢেউ লাগায় গ্রামের বসতবাড়ি গুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। খলিল মিয়া বলেন, দুই দফা বন্যার কারণে হাওর এলাকার নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। স্যানিটেশন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। তারা গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ছোট ছোট শিশুরা পরিবারের লোকজনের অগোচরে হাওরের পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছেন। নারীরা নড়াচড়া করার এতো টুকুর স্থান পায় না।

সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া স¤পাদক অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার বলেন, আমি বেহেলি, মশলঘাট, বদরপুর, রাধানগর ইসলামপুর, হরিনাকান্দি হাওরিয়া আলীপুর, সোলেমানপুর বাজারসহ ২০ টি গ্রাম ঘুরে এসেছি। এসব এলাকার অনেক মানুষ ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেন। জেলা প্রশাসনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১ টি উপজেলা ও চারটি পৌরসভার ৩৫২টি আশ্রয় কেন্দ্রে ২ হাজার ২৯৭ টি পরিবারের ৯ হাজার ১৯৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩ হাজার ৩৬৪ নারী ৩ হাজার ১১২ জন ও শিশু ২ হাজার ৭০৮ জন। সদর বিশ্বম্ভরপুর তাহিরপুর জামালগঞ্জ ছাতক দোয়ারাবাজার শাল্লা দিরাই দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ধর্মপাশা জগন্নাথপুর উপজেলা ও চারটি পৌরসভার ৯৮ হাজার ৯৫৬ টি পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৮৫৫ মেট্রিকটন চাল, ৪৭ লাখ ১ কোটি ৩০ লাখ ৯২ হাজার ২৫০ টাকা ও ২ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২ লাখ টাকার গো খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে ৬৬২ টি গবাদি পশু নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় একটি করে মেডিকেল টিম স্বাস্থ্য সেবার কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার বলেন, জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়ন পুরোটাই ভয়াবহভাবে বন্যা কবলিত। জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, বেহেলী ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন। প্রতিটি উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ মাঠে কাজ করছেন। পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, সুনামগঞ্জ ১ নির্বাচনী এলাকাটি বিশাল । এখানে বড়ো বড়ো হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকায় দুর্গম গ্রাম রয়েছে। মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাতে কোন মানুষ বন্যায় কষ্ট না করে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা হচ্ছে।

50% LikesVS
50% Dislikes
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ