সর্বশেষ

বৃষ্টিপাত আল্লাহর নিয়ামত সমূহের মধ্যে অন্যতম

 

আল্লাহ তাঁর অসংখ্য নিয়ামাত তাঁর বান্দাদের চোখের সামনে উন্মোচিত করে রেখেছেন, যেন তারা এসব দেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। তিনি ফেরেশতাদেরকে আদেশ করেন তারা যেন বাতাসকে প্রবাহিত করে, মেঘমালাকে ভাসিয়ে নেয় এবং তা থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে। আর এর দ্বারা যেন বান্দারা উপকৃত হতে পারে। বৃষ্টি আল্লাহ তাআলার অফুরন্ত রহমত। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বান্দার কল্যাণ এবং রিজিকের ব্যবস্থা করেন।

কয়েকদিন অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষিত হলেই মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভাষায় আপত্তিকর মন্তব্য করে বসে। কিন্তু কুরআনের বর্ণনায় বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যেমন সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তেমনি মানুষের কল্যাণেই বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। একজন খাঁটি মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত যখনই বৃষ্টি নামবে তখন কোনো প্রকারের হা-হুতাশ না করে দোয়া করা। আশা করা যায় মহান আল্লাহ এই দোয়া কবুল করবেন।

এছাড়া রাসুল (সা.) বৃষ্টির পানিকে খুব পছন্দ করতেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একবার রাসূলের (সা.) এর সঙ্গে থাকাকালে একবার বৃষ্টি নামল। তখন তিনি পরিধেয় প্রসারিত করলেন, যাতে পানি তার শরীর স্পর্শ করে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কেন এমন করলেন? রাসূল (সা.) বললেন, কারণ এটা তার রবের কাছ থেকে মাত্রই এসেছে। [মুসলিম : ৮৯৮]
বৃষ্টি বর্ষণের বিষয়ে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার বান্দারা যদি আমার বিধান যথাযথ মেনে চলত, তবে আমি তাদের রাতের বেলায় বৃষ্টি দিতাম আর সকাল বেলায় সূর্য (আলো) দিতাম এবং কখনও তাদের বজ্রপাতের আওয়াজ শুনাতাম না।’ (মুসনাদে আহমদ)
আমাদের নবীজি বৃষ্টি এলেও দোয়া করতেন, আবার বৃষ্টি না হওয়ার জন্যও দোয়া করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) যখন বৃষ্টি দেখতেন তখন বলতেন –
‘আল্লাহুম্মা, সায়ি্যবান নাফিআ।’ হে আল্লাহ, এ যেন হয় কল্যাণকর বৃষ্টি (বুখারি, ১০৩২)।

বৃষ্টি আল্লাহর অনেক বড় রহমত ও নিয়ামত। বৃষ্টি না হলে বুঝতে হবে, আমরা একটা রহমত থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। পবিত্র কোরআনের অনেকগুলো আয়াত তা প্রমাণ করে।

যেমন মহান আল্লাহ বলেন-
‘আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে থাকি পরিমাণ মত অতঃপর আমি জমিনে সংরক্ষণ করি এবং আমি তা অপসারণও করতে সক্ষম। অতঃপর আমি তা দ্বারা তোমাদের জন্যে খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান সৃষ্টি করেছি। তোমাদের জন্যে এতে প্রচুর ফল আছে এবং তোমরা তা থেকে আহার করে থাক। এবং ঐ বৃক্ষ সৃষ্টি করেছি, যা সিনাই পর্বতে জন্মায় এবং আহারকারীদের জন্যে তৈল ও ব্যঞ্জন উৎপন্ন করে।’ (সুরা মুমিনুন : আয়াত ১৮-২০)
‘তিনিই স্বীয় রহমতের প্রাক্কালে বাতাসকে সুসংবাদবাহীরূপে প্রেরণ করেন। এবং আমি আকাশ থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্যে পানি বর্ষণ করি। তা দ্বারা মৃত ভূভাগকে সঞ্জীবিত করার জন্যে এবং আমার সৃষ্ট জীবজন্তু ও অনেক মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে। এবং আমি তা তাদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিতরণ করি, যাতে তারা স্মরণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক অকৃতজ্ঞতা ছাড়া কিছুই করে না। (সুরা ফুরকান : আয়াত ৪৮-৫০)
‘তিনিই আল্লাহ, যিনি নভোমণ্ডল ও ভুমণ্ডল সৃজন করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্যে ফলের রিজিক উৎপন্ন করেছেন এবং নৌকাকে তোমাদের আজ্ঞাবহ করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে সমুদ্রে চলা ফেরা করে এবং নদ-নদীকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।’ (সুরা ইবরাহিম : আয়াত ৩২)
‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন অতঃপর আমি এর দ্বারা সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি, অতঃপর আমি এ থেকে সবুজ ফসল নির্গত করেছি, যা থেকে যুগ্ম বীজ উৎপন্ন করি। খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং আঙ্গুরের বাগান, যয়তুন, আনার পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত এবং সাদৃশ্যহীন। বিভিন্ন গাছের ফলের প্রতি লক্ষ্য কর যখন সেুগুলো ফলন্ত হয় এবং তার পরিপক্কতার প্রতি লক্ষ্য কর। নিশ্চয় এ গুলোতে নিদর্শন রয়েছে ঈমানদারদের জন্যে।’ (সুরা আনআ’ম : আয়াত ৯৯)
‘তিনি তোমাদের জন্যে আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। এই পানি থেকে তোমরা পান কর এবং এ থেকেই উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়, যাতে তোমরা পশুচারণ কর। এ পানি দ্বারা তোমাদের জন্যে উৎপাদন করেন ফসল, যয়তুন, খেজুর, আঙ্গুর ও সর্বপ্রকার ফল। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা নাহল : আয়াত ১০-১১)
‘তিনি খুঁটি ব্যতীত আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করেছেন; তোমরা তা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকার জন্তু। আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি, অতঃপর তাতে উদগত করেছি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদরাজি।’ (সুরা লোকমান : আয়াত ১০)
‘তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর স্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে নিজ নিজ পরিমাণ অনুযায়ী। অতঃপর স্রোতধারা স্ফীত ফেনারাশি উপরে নিয়ে আসে। এবং অলঙ্কার অথবা তৈজসপত্রের জন্যে যে বস্তুকে আগুনে উত্তপ্ত করে, তাতেও তেমনি ফেনারাশি থাকে। এমনি ভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেন। অতএব, ফেনা তো শুকিয়ে খতম হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এমনিভাবে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।’ (সুরা রাদ : আয়াত ১৭)
‘যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে। অতএব, আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাকেও সমকক্ষ করো না। বস্তুতঃ এসব তোমরা জান।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২২)
‘তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর পৃথিবী সবুজ-শ্যামল হয়ে উঠে। নিশ্চয় আল্লাহ সুক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে খবরদার।’ (সুরা হজ : আয়াত ৬৩)
‘তুমি কি দেখনি আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টিবর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা আমি বিভিন্ন বর্ণের ফল-মূল উদগত করি। পর্বতসমূহের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ-সাদা, লাল ও নিকষ কালো কৃষ্ণ।’ (সুরা ফাতির : আয়াত ২৭)
‘আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা বাগান ও শস্য উদগত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়। এবং লম্বমান খেজুর গাছ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এমনিভাবে পুনরুত্থান ঘটবে।’ (সুরা ক্বাফ : আয়াত ৯-১১)
‘তাঁর আরও নিদর্শন তিনি তোমাদেরকে দেখান বিদ্যুৎ, ভয় ও ভরসার জন্যে এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমান লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ (সুরা রূম : আয়াত ২৪)
‘তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দরজা প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভুমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে।‘ (সুরা ক্বামার : আয়াত ১১-১২)
‘বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে বর্ষণ করেছেন পানি; অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্যবিচ্যুত সম্প্রদায়।’ (সুরা আন নমল : আয়াত ৬০)

মানুষের জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা অনেক। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পানি প্রয়োজন। মানুষ পানি পান করে। পানির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে। পানির মাধ্যমে ফসলাদির চাষ করে।
পানি দিয়ে ওযু করে। ওযুর মাধ্যমে পাপ ও ভুলত্রুটি মার্জনা হয়। বৃষ্টি আল্লাহর নেয়ামত। যদি কখনো তা মানুষের কোনো ক্ষতি কারণ হয়ে দাঁড়ায়; তাহলে বুঝতে হবে- এটা মানুষের গোনাহের ফল।

প্রিয় নবি (সঃ) মেঘের গর্জনের সময় তিনি কথাবার্তা ছেড়ে দিতেন। মেঘের ভয়াবহতা এবং অনিষ্টতা থেকে হেফাজত থাকতে তাসবিহ এবং দোয়া পাঠ করতেন-
“আল্লাহুম্মা হাওয়াইলানা ওয়া লা আলাইনা; আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াল ঝিবালি ওয়াল উঝামি ওয়াজ জিরাবি ওয়াল আওদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজারি”।
অর্থ : হে আল্লাহ! আমাদের আশে-পাশে বৃষ্টি বর্ষণ কর। আমাদের ওপরে করিও না। হে আল্লাহ! টিলা, পাহাড়, উচ্চভূমি, মালভূমি, উপত্যকা এবং বনাঞ্চলে বৃষ্টি বর্ষণ কর।’ (বুখারি)

আল্লাহ এ দুনিয়াতে মানুষের জন্য দয়াময়। যারা তাঁকে স্বীকার করেন তাদেরকে যেমন তিনি রিজিক দেন, দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ দান করেন। ঠিক তেমনি যারা তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর অবাধ্য হয় তাদেরকেও তিনি এ সব নেয়ামত দান করেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত এবং হাদিস মোতাবেক বৃষ্টির উপকারিতা গ্রহণের তাওফিক দান করুন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সব ধরনের অনিষ্টতা থেকে হেফাজত করুন – আমিন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ