সর্বশেষ

সিলেটের হারিয়ে যাওয়া সেই ‘মুড়ির টিন’ বাস!

আমার ছোট্ট বেলায় সূযোগ হয়েছিল মুড়ির টিন বাস চড়ার! এখনো কল্পনায় ভাসে সত্তর দশকের শেষের দিকে আমাদের সিলেট শহরের বাস সার্ভিসের কথা। সত্তর দশকের আগে থেকে আমাদের দেশে এক ঐতিহ্যবাহী পরিবহন ছিল। লোকে ডাকতো মুড়ির টিন। দেখতে ছোট বাসের মতো। অনেকের মতে পিছনে বাঁদূর ঝোলা বা মুড়ির মতো ভড়াট করে ঘন ঘন যাত্রি উঠানো ও নামানোর কারনে নাম হয়েছে মুড়ির টিন। খুব ইচ্ছে করে, যদি পূনরায় একবার মুড়ির টিন চড়তে পারতাম! যারা চড়েছেন তারাই বলতে পারেন ভ্রমণের আনন্দ, কষ্ট বা অভিজ্ঞতা!
★কেমন ছিল মুড়ির টিন
আজও আমরা কোনো গণপরিবহনের বেহাল দশা বুঝাতে বলি, শালার মুড়ির টিন মার্কা সার্ভিস!
মুষলধারে বৃষ্টি হলে অনেক বাসে ছাদ চুইয়ে জানালা দিয়ে ভেতরে পানি পড়ত। ফোঁটা ফোঁটা পানিতে ভিজতে থাকেন যাত্রীরা। সেই সময় মুড়ির টিন বা অন্যান্য বাসের ভেতরে মজাদার কিছু লেখা থাকতো। যেমন* একশ পাঁচশো টাকার ভাংতি নাই। *ব্যবহারে বংশের পরিচয়। *থুথু বাহির, হাত ভেতর। *চালকের সিটের পেছনে লেখা থাকতো— চলন্ত অবস্থায় চালকের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ। আর তার মাথার ওপরে লেখা থাকতো— আপনার অভিযোগ চালককে বলুন।
★মুড়ির টিনগুলো কিভাবে এলো?
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ। ব্রিটিশ সরকার রেখে যাওয়া ট্রাক গুলো নিলামে কিনে নেয় ব্যবসায়িরা। সেই ট্রাক গুলোকে পরবর্তিতে মুড়ির টিনে রুপান্তরিত করা হয়। ট্রাকের কাঠের বডির সাথে বাসের আদলে কাঠ দিয়ে কাঠামো তৈরি করে এর উপর দিয়ে টিন দিয়ে মুড়ে দেয়া হতো। সেই থেকেই বাস গুলোর নাম হয় মুড়ির টিন। মুড়িরটিন এর ভিতরটায় চারদিক বেঞ্চের মত করে সিট বসানো ছিল মাঝখানে বেশ ফাকা চায়গা থাকতো। সিটে ২০-২৫ জন বসা যেত। মাঝ খানের ফাকা জাগায় ২০-৩০ জন দাড়িয়ে থাকতো। ছাদে মাল অথবা যাত্রি উঠানো হতো। গাড়ির সামনের দিকে হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে গাড়ি স্টাট দিতে হতো (সেলো মেসিনের মতো) বর্তমানের মতো হর্ন ছিলনা। ছিল ভেপু। পিতলের হর্ন চাপ দিয়ে বাজানো হতো। গাড়ির গতি থাকত ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটার। স্টিয়ারিং ছিল শক্ত।
একসময় জকিগঞ্জ তথা সিলেট অঞ্চলের মানুষ পায়ে হেটে বা অন্য কোন বাহনে করে দূরপাল্লায় চলাচল করতেন। জনগণের একমাত্র যানবাহন হিসেবে মুড়ির টিন বাস সার্ভিস ছিল ভরসা। আবার তা ছিল হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি গাড়ি। তাই তা অহরহ পাওয়া যেত না। জকিগন্জের উদ্দেশ্য সকালে ফার্স্ট, সেকেন্ড ও থার্ড এই তিনটি গাড়ি একে একে সিলেটে ছেড়ে যেত। আবার বিকালে সেগুলো জকিগঞ্জে গিয়ে পৌছিত।
সেই সময় সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ছিল না। সিলেট নগরীর কদমতলী পয়েন্টের নিকট খালি জায়গায় ছিল পূরাতন বাসস্ট্যন্ড। হাতে গোনা কয়েকটি দোকান এবং বাস কাউন্টার ছিল। পূর্বান্চল রুটে এখান থেকেই বাস ছেড়ে যেত। যাত্রীরা টিকেট কেটে বাসে উঠতেন। দূরপাল্লার রুট ছিল * সিলেট- সূতারকান্দি- বরাইগ্রাম- জকিগন্জ লাইন। সিলেট- ফূলসাইন- ঢাকাদক্ষিণ লাইন। এই রুটকে ডাকা হত পাড় লাইন।
সিলেট শহর থেকে শহরতলীতে যাতায়াতের জন্য জন্য জনপ্রিয় টাউন সার্ভিস ছিল। বাহন ছিল মুড়ির টিন। কোর্ট পয়েন্ট থেকে ছেড়ে যেত। অনেক রুট ছিল যেমন, সিলেট টূ, মোগলাবাার, জালালপুর, টূকেরবাজার, লালা বাজার, শাহপরান, হেতিমগঞ্জ। সর্বশেষ ভাড়া ছিল জনপ্রতি সম্ভবত দেড় টাকা। আশির দশকের পর থেকে উঠে যেতে থাকে এই মুড়ির টিনগুলো। আজ আধুনিক যানবাহনের সয়লাবে সিলেটর রোড থেকে হারিয়ে গেছে ঐহিত্যবাহী মুড়ির টিন বাস। বাংলা সাহিত্যের অনেক উপন্যাসে ঘুরে ফিরে এসেছে মুড়ির টিন প্রসঙ্গ। হুমায়ূন আহমেদও তার বিভিন্ন উপন্যাসে মুড়ির টিন পরিবহনকে এনেছেন।

Mujibkoyru@gmail.com

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ