সর্বশেষ

করোনা ভাইরাসের কারণ এবং এর প্রতিকার

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের উদ্ভব হয়। বর্তমানে চীন ছাড়াও পৃথিবীর ১৮৮ টিরও বেশি দেশে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে! যে ভাইরাসের ঔষধ আবিষ্কারে বিজ্ঞানীদের রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটতেছে! যদিও আমেরিকা সহ অনেক দেশ ভেকসিন আবিস্কারের সফলতার কথা বলতেছে, কিন্তু বাস্তবতা হল ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাস তার জিন ৩৫০ বারেরও বেশি পরিবর্তন করে ফেলেছে যা উদ্ভেগের বিষয়।
এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত না হওয়ায় বিশ্ব (স.) এর নসিহত মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগন!
সম্প্রতি চীন করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার সাধারণ যে উপায় অবলম্বন করছে, দেড় হাজার বছর আগে প্রিয়নবি (স.) সে উপদেশ দিয়ে গেছেন! তাহলে হাদিসের এ আমলই কি অনুসরণ করছে চীন?

এ রোগের সয়লাব ঠেকাতে চীন সরকার হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে রোগীসহ কোনো মানুষকে অন্য শহরে পাঠাবে না। আবার অন্য শহর থেকে কোনো মানুষকেও এ শহরে প্রবেশ করতে দেবে না। যাতে এ রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে না পারে এবং এতে করে দেশটি সফলতাও দেখিয়েছে ! চীনকে অনুসরণ করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশও সফলতা খুঁজতেছে। এ পদ্ধতি অনুসরণে হাদিসের
নির্দেশনাও এটি।
হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বর্ণনা করেন-

‘পৃথিবীর কোনো দেশে বা অঞ্চলে যদি কোনে প্রকার প্লেগ বা মহামারি জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে তোমরা যারা (ওই অঞ্চলের) বাহিরে আছ তারা ওই শহরে প্রবেশ করো না। আর যে শহরে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তোমরা যদি সে শহরে বসবাস করো তবে তোমরা সে অঞ্চল বা শহর থেকে বাহির হয়ো না।’ (বুখারি, মুসলিম)

মহামারীর কারণঃ
করোনাভাইরাস এক অজানা আতঙ্ক। রাসুল (সা.) মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন অন্যায়, জুলুম ও অশ্লীলতার কারণে আল্লাহ তাআলা জালেম ও অন্যায়কারীদের ওপর অপরিচিত মহামারি চাপিয়ে দেন। হাদিসে এসেছে-
‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।’ (ইবনে মাজাহ)

মানব সভ্যতায় অনাচার অশ্লীলতার বৃদ্ধির ফলে নেমে আসছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। প্রিয়নবী (স.) বলেন “যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা প্রকাশ্যভাবে চলতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে প্লেগ এবং এমন অভিনব দুরারোগ্য ব্যাধি দেওয়া হয়, যা তাদের পূর্বপুরুষেরা কখনো শোনেনি”। (দায়লামি)

আবার অনেক সময় রোগ-শোকের মাধ্যমে মু’মিনকে পরীক্ষা করা হয়, এতে তার ঈমানিশক্তি বৃদ্ধি পায়। রোগের মধ্যেও পাওয়া যায় কল্যাণের বার্তা। যেমন:

একদা প্রিয়নবী (স.) হযরত আবু হুরাইরাকে (রা.) সঙ্গে নিয়ে জ্বরের রোগী দেখতে যান। তিনি (সা.) বলেন “সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ্ বলেন, ‘আমার আগুন দুনিয়াতে আমি আমার মু’মিন বান্দার ওপর প্রবল করি, যেন তা আখিরাতের আগুনের বিনিময় হয়ে যায়’” (তিরমিযি)।
মারাত্মক মরণব্যাধি এ করোনাভাইরাস। এ ভাইরাস থেকে বাঁচতে কুরআন সুন্নাহে কী ধরনের নসিহত রয়েছে তা অনুসরণ করাই সবার জন্য জরুরি।

করোনা ভাইরাসের এই সময়ে আমাদের
করনীয়ঃ
১. আল্লাহুম্মা ইন্নি আঊযুবিকা মিনাল বারাসি ওয়াল জুনূনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিন সায়্যিইল আসক্বামি। (আবু দাউদ: ১৫৫৪)। বেশি বেশি করে পড়া।

২. রাসূল স. যখন ঘর থেকে বের হতেন তখন এ দুআ পড়তেন, বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। (আবু দাউদ: ৫০৯৫)।
তিনি বলেন, তখন ফিরিশতারা তার জন্য এ বলে দুয়া করতে থাকে, তোমাকে সঠিক পথ দান করা হোক এবং সবধরণের বালা মছিবত ও মন্দতা থেকে রক্ষা করা হোক।

৩. যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার এই দুআটি পড়বে , ‘বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়ার্দুরু মাআ ইস্মিহী শাইউন ফিল র্আদি ওয়ালা ফিস্ সামা-ই ওয়া হুওয়াস্ সামিউল আলীম’ তাহলে সে আকস্মিক বিপদ-আপদ মহামারী থেকে রক্ষা পাবে। (তিরমিযী: ৩৩৮৮)।

৪. বেশি বেশি দান-সাদকা ও মাতা-পিতার সেবা করা, পরিবারের লোকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। নবী (সা.) বলেন, দান-সাদকা ও সৎ কর্ম অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে।

৫. তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে দুআ করা। নবী সা. বলেন, তাহাজ্জুদের সালাত শরীরের যাবতীয় রোগবালাই দূর করে।

৬. নিজের ঘর ও অঞ্চল থেকে অতীব প্রয়োজন ছাড়া বের না হওয়া। রাসূল স. বলেছেন, যখন তোমরা কোথাও মহামারির সংবাদ পাবে তখন সেদিকে যেও না। আর যদি তোমরা মহামারীতে আক্রান্ত ভূমিতে পূর্ব থেকেই অবস্থান করো তাহলে সেখান থেকে পালিয়ো না। (বুখারী: ৫৭৩৯)।
একান্ত যদি যেতেই হয় তাহলে সেই এলাকা বা শহরে প্রবেশ করে এই দুআ করা- আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরা হাযিহিল ক্বারইয়াহ ওয়া খাইরা আহলিহা ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহা ওয়া র্শারি আহলিহা ওয়া শাররি মা ফীহা। (নাসাঈ: ৫/২৫৬)।

৭. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং ঘরবাড়ি ও আঙ্গিনা পরিচ্ছন্ন রাখা। যত্রতত্র কফ, থুথু এবং নাকের ময়লা না ফেলা।

৮. অজু অবস্থায় থাকা। কেননা হাদিসে শরীফে পবিত্রতাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং বলেন ‘হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বারবার হাত ধুতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরতে হবে’। ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং আরও বলেন ‘আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে মুখোশ পরুন, নিজে অসুস্থ না হলেও, অপরের সংস্পর্শ এড়াতে মুখোশ পরুন’।

প্রিয় ভাই-বোনেরা, ভয় পাবেন না। মুমিনদের জন্য আল্লাহর রাসূলের ওয়াদা আছে, মহামারীতে মৃত্যু হলে শহিদি মৃত্যু হবে। চলমান এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে আল্লাহর দিকে চূড়ান্তভাবে ফিরে যাওয়া ব্যতীত সত্যিই আর কোনো উপায় নেই। সাধ্যমত সতর্ক থাকুন, তাওবাহ-ইস্তিগফারে লেগে যান। চোখ, মুখ এবং কানের হেফাজত করুন, এসব অঙ্গের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকু। সর্বোপরি নিজের উত্তম সমাপ্তির জন্য প্রস্তুতি নিন। নিজেদের ওসিয়তনামা প্রস্তুত করুন। আল্লাহর তাকদিরে সন্তুষ্ট থাকুন। সবসময় মাথায় রাখুন, এই দুনিয়ায় মুমিনের হারানোর কিছু নেই। নেক আমল নিয়ে যেতে পারলে সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার কোনো অভাব হবে না,
ইনশাআল্লাহ্।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহসহ পুরো মানবজাতিকে দুনিয়ার সব অপরিচিত রোগব্যাধি থেকে হেফাজত করতে অন্যায় জুলুম ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ